গল্পঃ রহস্যময় রূপবতী কন্যা | লেখকঃ তাসফি আহমেদ
গল্পঃ রহস্যময় রূপবতী কন্যা | লেখকঃ তাসফি আহমেদ
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল৷ আমি প্রায় অনেক্ষন থেকেই এখানে বসে আছি৷ আমি জানি মেয়েটা আসবে না! নিশ্চিত ভাবেই জানি৷ তাও বসে আছি৷ আজ দুদিন হলো, আমি সারাটা বিকেল এখানে বসেই কাটাচ্ছি৷ প্রতিটা মূহুর্ত যেন চরম অস্থিরতায় কাটাচ্ছি। সম্ভবত আমি ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যাচ্ছি৷
বসন্তের শেষ বিকেল। মৃদু শীতভাব আর হিম বাতাস, মনের মাঝে এক অন্য রকম অনুভূতি জাগায়। ফুলের সুবাসে মাতোয়ারা চারপাশ, গাছে গাছে কচিপাতা আর উড়ে চলা পাখির মধুর কূজন।
আমার সাথে মীরার প্রথম দেখা হয়েছিল এই পার্কেই। আমি অয়নকে পাশে নিয়ে বসে ছিলাম৷ অয়ন আমার বড় ভাইয়ার ছেলে৷ বাচ্চাটাকে নিয়ে প্রায়ই এই পার্কে আসি৷ শহরের জীবনটা খুব অপছন্দ হলেও এই পার্কটা আমার ভীষণ পছন্দের৷ এখানকার পরিবেশ এতো স্নিগ্ধ আর মুগ্ধকর, বলার মতো না৷ এরচে বড় বৈশিষ্ট্য হলো জায়গাটা অসম্ভব ক্লীন৷ ধুলোর শহরে এমন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সত্যিই মুগ্ধকর।
আমি অয়নকে একটা ফুল গাছের বিবরণ দিচ্ছিলাম। দূর থেকেই। ঠিক তখনই আমি দেখি! মীরাকে! নীলচে রঙের একটা শাড়ি পরেছে৷ এতো সুন্দর করে হিজাব বাঁধলো৷ আমি কেমন জানি থ হয়ে গেলাম৷ যে কেউই আমার দিকে তাকালে বলতো, এই ছেলে হয় জীবনে মেয়ে দেখেনি, অথবা কখনো এতো সুন্দর মেয়ে দেখেনি৷
দ্বিতীয় কথাটা সত্য। আমি আসলে আমার জীবনে এতো সুন্দরী কোনো মেয়ে দেখিনি। আমি এই কথাটা তখন থেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম যখন মীরাকে দেখি।
মীরার চেহারার কাঠামোটা এতো শৃঙ্খল! চোখ জোড়া এতো নিষ্পাপ ভাবে অবস্থান করছে যে দেখলেই অনুভব হয়, মনের ভেতরেটা গলে পানি হয়ে গেছে৷ কেমন এক শান্তির প্রবাহ সমস্ত হৃদয়কে গ্রাস করে নিয়েছে।
আমার সবচে যে জিনিসটা পছন্দ হয়েছে তা হলো ওর চোখের কাজল৷ আমি দূর থেকেই মেয়েটার কাজলের স্পষ্ট মায়া অনুভব করছিলাম৷ মেয়েদের এই জিনিসটাই আমাকে অসম্ভব টানে৷ কাজল পরা কোনো মেয়েকে কখনোও অসুন্দর লাগেনি। অন্তত আমার কাছে না৷
আমার খুব ইচ্ছে হলো আমি উঠে গিয়ে ওকে বলি, আপনি বিশ্বাস করবেন না আপনাকে আজ অসম্ভব সুন্দরী লাগছে৷ আপনি হয়তো ভাবছেন আমি ফ্লার্ট করছি৷ আপনাকে পটানোর চেষ্টা করছি৷ বিশ্বাস করুন আমি জীবনে কোনো মেয়েকে পটানোর চেষ্টা করিনি৷ আজও করব না৷ কিন্তু আমার মনে হলো এই বিষয়টি আপনার জানা উচিৎ। পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যতাকে একীভূত করে যে নিজের মাঝে নিয়ে রাখলেন, এই বিষয়টি আপনার মাথায় থাকা উচিৎ। আপনি হয়তো এসব নিয়ে ভাবেনই না৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনার ভাবা উচিৎ। আপনি যে অসম্ভব রূপবতী, তাই!
পাশ থেকে অয়ন দৌড়ে গেল। একটু এগিয়ে কাকে যেন ডাক দিলো। মীরার পাশে ছোট্ট একটা বাবুকে দেখতে পাই আমি৷ ওর নাম স্নিগ্ধা। সে অয়নের ডাকে সায় দিলো। স্নিগ্ধাকে দেখতেই আমি খানিকটা হকচকিয়ে গেলাম৷ আমার মনে হলো, হায়, এ কী হলো? এটা কি মেয়েটার বাচ্চা? মেয়েটা বিবাহিত?
আমার উচ্ছ্বসিত হৃদয়ে হঠাৎই যেন ঝড় উঠলো। আকাশ মেঘলা করে, চারপাশে কালো করে নেমে আসা এক ভয়ানক ঝড়৷
অয়ন স্নিগ্ধাকে ডাকতেই এগিয়ে আসে সে। তার পেছন পেছন জগৎ-সংসারের একমাত্র মায়াকন্যা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে৷ তারা যতোই নিকটে আসছে, আমার হৃদয়ের ভেতরটা ততোই যেন অস্থির হচ্ছে৷ হৃদয়-ঝড় ততোই যেন উশৃংখল হয়ে উঠছে৷
এক পর্যায়ে অয়ন স্নিগ্ধার সাথে কথা বলার ব্যস্ত হয়ে পড়ে৷ সেই একই সময়ে অয়নের আরেকটা বন্ধু দৌড়ে আসে৷ এরা দু'জন একই ক্লাসে পড়ে৷ তাই এতো পরিচিত। তবে স্নিগ্ধাকে আগে দেখিনি কখনো৷ নতুন এসেছে সম্ভবত। দৌড়ে আসা বন্ধুটাকে চিনি আমি৷ তার রৌদ্র। থাকে এখানে৷ পাশেই তার বাসা৷ বেশ চালাক ও বদমাশ কিসিমের একটা ছেলে। এর সাথে অয়নকে একা ছেড়ে দেওয়া যায় না৷ ঝামেলা পাকিয়ে বসে। আমি এগিয়ে গেলাম বাচ্চা গুলোর দিকে৷ আমাকে এগিয়ে আসতে দেখেই অয়ন ফিরে চাইলো আমার দিকে৷ এরপর সিগ্ধাকে কি যেন বলল। সিগ্ধা এগিয়ে এসে আমাকে এতো সুন্দর করে সালাম দিলো৷ আমি একদম অবাক হয়ে গেলাম। আমি সামান্য হেসে সালামের জবাব দিয়ে বললাম, কেমন আছো বাবু? কী নাম তোমার?
সিগ্ধা এক গাল হেসে বলল, আমার নাম ফাহমিদা স্নিগ্ধা। আমি অয়নের নতুন বন্ধু৷ আমরা একই ক্লাসে পড়ি।
পরে বিস্তারিত জানতে পারলাম যে ওরা এই কলোনিতে নতুন এসেছে। মীরার ব্যাপারটাও পরে জানতে পারলাম। সে আসলে সিগ্ধার আন্টি হয়৷ যাই হোক, এতোটুকু জানার পর খানিকটা যে স্বস্তি পেয়েছি, বুকের পাঁজরে যে সামান্য বল এসেছে, তা না বললেই নয়৷
এখানে থেকেই মীরার সাথে পরিচিতি, এই পরিচিতি গড়ায় আলাপে, আলাপ থেকে আপাতত আলাপেই আছে৷ এখন আমাদের একটা নিত্য রুটিন এই যে আমরা প্রতি বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার এখানে এসে মিলিত হই, আলাপ করি এবং সন্ধার খানিক আগেই ফিরে যাই৷ আমাদের মাঝে কোনো বাড়তি আলাপ নেই, নেই কোনো প্রেমজনিত ইঙ্গিত।
কিন্তু ইদানীং আমি নিজের মাঝে অত্যাধিক লোভ অনুভব করছি। সাক্ষাৎকারে লোভ! সেদিন আবার মীরার সাথে একটা ছেলেকে রিক্সায় দেখেও বুকের মাঝে কেমন এক তোলপাড় শুরু হলো৷ আশ্চর্যজনক ভাবে ওইদিনের সেই দৃশ্যের ফলাফল এতো মারাত্মক হলো যে আমি দুই তিন দিন ঠিক ভাবে ঘুমাতেই পারিনি৷ আমার কাছে মনে হতে থাকে মীরা আমার জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ এবং কেউ তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে আমার থাকে৷ আমার মনে হচ্ছে আমি মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলছি৷ কিছুদিন গেলে যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব হলেও পুরোপুরি এর নিষ্পত্তি এখন অব্দি অনুভব করিনি৷
এরপর থেকে আমি অত্যান্ত লোভাতুর হয়ে যাই মীরার সংস্পর্শ পাওয়ার৷ আমার ইচ্ছে হতে থাকে যে আমি সারাদিন ওর সাথে কাটাই। শুধু সপ্তাহে তিন দিন না, সপ্তাহে সাত দিনই যেন আমরা একসাথে কাটাই৷ অন্তত অল্প কিছু সময় হলেও৷ বেশি কিছু না৷ আমরা দু'জন নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ঘাসের চাদরে বসে খানিকটা সময় আলাপ করি৷ এতো গভীর আলাপেরও প্রয়োজন নেই৷ মীরা আমাকে বলুক, তার সারাদিন কেমন গিয়েছে৷ আমিও বলি আমি কেমন কাটিয়েছি এই দিন৷
মীরা যেমন সুন্দর করে হাত নাড়িয়ে বলবে,
-এই জানো আজ কী হয়েছে, নীলার বয়ফ্রেন্ড নীলাকে সামনে রেখেই আমার রূপের প্রশংসা করছিলো৷ নীলা এতো রেগে গেল! আমিও দু'চারটা কথা শুনিয়ে দিয়েছে শালাকে৷ বেটা তুই তোর প্রেমিকার প্রশংসা করবি। তা না করে তুই কেন পর-নারী নিয়ে পড়বি? এটা কি ঠিক হলো? এটা কেমন প্রেম বলো তো? এ জন্যেই আমি এসব রিলেশন ফিলেশন পছন্দ করি না৷ আজাইরা জিনিস৷ আচ্ছা তুমিই বলো এটা কি রাতুল (নীলার তথাকথিত প্রেমিক) ঠিক করেছে?
সেদিন ওর ওই কথাটা শোনার পর আমার দুইটা কারণে মেজাজ ও মন খারাপ হয়েছে৷ প্রথমত রাতুলের বাচ্চা বেটা তুই রূপের প্রশংসা করার আর মানুষ পাইলি না? মীরাকেই কেন? হোয়াই?
মন খারাপ হলো এই নিয়ে যে মীরা এসব রিলেশন টিলেশন পছন্দ করে না৷ অর্থাৎ তার আসলেই রিলেশনের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই৷ বিষয়টি দুশ্চিন্তার বটে, তবে সম্ভাবনার আসলেই শেষ থাকে না।
আমি ওর প্রতি প্রশ্নের জবাবই অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে দেই৷ আমি অত্যন্ত সিরিয়াস হয়ে বলি,
-ছেলেটা বদ৷ এদের মতো ছেলেদের জন্যেই বাকি ছেলে গুলোর বদনাম হয়৷ ইডিয়ট!
এভাবে আমাদের আলাপ চলে। মাঝে মাঝে কিছু আলাপ এতো গভীর হয়! মীরা বলে,
-তুমি একাকীত্বকে কীভাবে দেখো?
-আমার তো বেশ লাগে৷ আমি প্রায় সময়ই রুম অন্ধকার করে বসে থাকি৷ অন্ধকার আমার পছন্দ ভীষণ।
-অবাক করলে। অন্ধকার ভালো লাগে তাদের যারা হতাশ হয়, নিজেকে আবদ্ধ করে নেয়, আড়াল করে, তুমি কেন?
-ভালোবাসায় কোনো নিয়ম নীতি নেই, তা কি জানো? অন্ধকার ভালোবাসতে হলে আমাকে যে হতাশ হতেই হবে এমন তো নয়৷ তাছাড়া আমি যে হতাশ নই, তা তো কেউ নিশ্চিত ভাবে বলতে পারবে?
-তোমার কি গোপন কোনো ব্যথা আছে?
-ব্যথা কি গোপন থাকে?
-রাখলে তো থাকে। যেমন তুমি! এতো প্রাণবন্ত আর উচ্ছ্বসিত, অথচ আমি কেবলই জানলাম তুমি হতাশায় ভুগছো।
-ঠিক ভুগছি না! আমার হতাশারা আসলে বৃদ্ধ হয়েছে৷ আমি নিজেও তাদেরকে কাবু করে নিয়েছিলাম। আমি যবে থেকে বুঝতে শিখেছি, আপনি ছাড়া এই দুনিয়ায় আপনার কেউ নেই, আপনার লড়াই আপনাকেই লড়তে হবে, তখন থেকেই আমার এসবের উপর আয়ত্ব এসে গেছে৷ আমি এখন আমার ব্যথাকে উপভোগ করি। ব্যথা উপভোগ্য না হলেও তাহাকে উপভোগ্য করার আয়োজন করি।
মীরা এক মনে আমার কথা শুনে। বলে,
-তা কীভাবে?
আমি হাসি৷ বলি,
-মীরা, এই পৃথিবীতে আমরা কেউই সুখি নই। অন্তত চিরস্থায়ী সুখি তো নই-ই। আমরা সুখ খোঁজার চেষ্টা করি৷ কতো আয়োজন করি, সামান্য সুখের জন্যে৷ দুঃখের আয়োজনটাও সেইম। পার্থক্য কেবল ব্যথা এবং আনন্দে।
-তুমি কি কবি? কিংবা কখনো কাব্য করতে বুঝি?
আমি হাসি। বলি,
-আমি অসহায় এক ক্ষুদ্র প্রাণ৷ যার অস্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। অন্তত এই দুনিয়ায় তো নয়-ই৷
.
বৃষ্টির ফোটা পড়লো হাতের উপর৷ তাতেই যেন ধ্যান ভাঙ্গলো। চারপাশে তাকাতেই দেখলাম আলো মরে আসছে৷ সন্ধ্যার পূর্বক্ষণ। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বেশ অন্ধাকার লাগছে৷ আকাশে মেঘ করেছে৷ এ জন্যেই হয়তো। আমি বেঞ্চিটাতেই বসে থাকলাম৷ নামুক সন্ধ্যে। আমাকে ঘিরেই নামুক৷ বৃষ্টি আসুক৷ ভিজিয়ে দিক আমায়৷ ঝড় হোক! বজ্রপাতে মৃত্যু হোক আমার৷
সত্যি বলতে আমার বেশ অস্থির লাগছে৷ একদমই ভালো লাগছে না৷ নিজেকে কেমন গাধা মনে হচ্ছে৷ আজ প্রায় মাস তিনকে মেয়েটাকে চিনি৷ অথচ তার ফেসবুক আইডি নেইনি৷ নেইনি ফোন নাম্বারও৷ আমার সমস্যা এটা। খুবই মারাত্মক সমস্যা৷ আমি কখনো কারো পার্সোনাল স্পেসে ইন্টারফেয়ার করতে পারি না৷ যতোক্ষন না তারা আমাকে সেখানে এলাউ করে৷ মীরাও কখনো চায়নি ফেসবুক আইডি অথবা আমার ফোন নাম্বার৷ নিজেরটা দেওয়ার কথাও বলেনি৷ আচ্ছা সে না হয় মেয়ে মানুষ! এসব সে করবে না৷ কিন্তু আমি গাধা কেন চাইলাম না? কেন বলতে পারলাম না?
মীরা নেই! তার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ৷ দুই সপ্তাহের ছুটি৷ সে যাবে গ্রামের বাড়িতে৷ বেড়াতে৷ গ্রামের বাড়ি অতো দূরেও না যদিও। যেতে তিন-চার ঘন্টা লাগে। পরশু জাস্ট আমাকে এসে বলল, সে যাবে গ্রামের বাড়ি৷ সিগ্ধাকে নিয়ে আর আসতে পারবে না এ ক'দিন৷ তাই সিগ্ধাও আসবে না৷ এসব বলে গেল! কতো কথা বললো! তার গ্রামের বাড়ির কতো গল্প বলল! অথচ এই দুই সপ্তাহ আমাদের আলাপ কীভাবে হবে, কীভাবে আমরা কথা বলব একে অপরের সাথে, এসব নিয়ে সামান্য আলোচনাও করলো না সে৷ আমি এতো মুখিয়ে ছিলাম, একদম প্রস্তুত ছিলাম, সামান্য ইঙ্গিত পেলেই আমি নাম্বার বা ফেসবুক আইডি এক্সচেঞ্জ করে নিব৷ অথচ কিসের কি! সে তার আলাপ সেরে চলে গেল৷
সত্যি বলতে আমার খারাপই লেগেছিলো৷ আমার মনে হলো মেয়েটার মাঝে আসলে প্রেম ভালোবাসার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই৷ নেই কোনো প্রয়াস। সে এসব নিয়ে ভাবেও না হয়তো৷ হয়তো আমিই বেশি বেশি ভাবছি৷ ভেবে ভেবে পাগল হচ্ছি৷ এই দুইটা রাত আমি ঠিক ভাবে ঘুমাতে পারছি না৷ এতো অস্বস্তি আর অস্থিরতা আমি আমার জীবনেও অনুভব করিনি৷ জীবনেও না৷
বৃষ্টি বড় বড় ফোঁটা পড়ছে৷ গাছের পাতায় পড়ে একটা মিষ্টি শব্দ হয়৷ শব্দটা বেশ দারুণ৷ আমি চোখ বন্ধ করে তা অনুভব করার চেষ্টা করলাম, পাতা আর বৃষ্টির ফোঁটা মিলে যেন অনবদ্য এক তাল তুলছে৷
-এই ছেলে? তোমার মাথায় কী ঘিলু নেই? হ্যাঁ? এই সময়ে যে বৃষ্টিতে ভিজছ, জ্বর আসবে না? রোগ বাঁধানোর প্ল্যান করতেসো নাকি?
আমি হকচকিয়ে উঠি৷ চোখ মেলে দেখি মীরা দাঁড়িয়ে আছে৷ হাতে ছাতা৷ একটা নিজের মাথার উপর ধরে আছে৷ আরেকটা বন্ধ অবস্থায় হাতে আছে৷ আমি উঠে দাঁড়ালাম। মেয়েটা আজ কালো সেলোয়ার পরেছে৷ চোখে গাড় কাজল৷ আমার পায়ের কাপনি শুরু হলো যেন৷ এই সন্ধ্যাচাপা মূহুর্তে, বৃষ্টি সমেত এতো মায়া-স্নিগ্ধ চেহারার এমন এক রূপবতী যে কারো মনের মাঝে তুমুল ঝড় তুলতে প্রস্তুত। যে কারোই।
আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটা হাতের ছাতাটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়,
-এই নাও। কী বোকার মতো কাজ করছিলে বলো? এতো বড় একটা মানুষ, অথচ সামান্য কমনসেন্স নেই তোমার?
আমি কিছু বললাম না৷ ছাতাটা বাড়িয়ে নিলাম। মেলে মাথার উপর ধরলাম। মেয়েটা আবারো কঠিন স্বরে বলে,
-চেহারার এই হাল বানিয়েছো কেন? কী হয়েছে তোমার?
আমি নিচু স্বরে বললাম,
-কী হবে? কিছু হয়নি। তুমি এখানে? তুমি তো...
-বেশ কথা বলবা না ফাজিল ছেলে! কি হাল বানিয়েছো নিজের। কী হয়েছে বলো তো? এমন উসকোখুসকো হয়ে আছো কেন?
-কই? ঠিকই তো আছে৷ কোনো সমস্যা নেই।
মীরা কিছুটা সময় আমার দিকে ভ্রু কুচকে চেয়ে থাকলো৷ আমি গাধার মতো ওর চোখের দিকে চেয়ে থাকলাম। আমার মনে হলো আমি আজীবন এই চোখ দুটো দেখে কাটিয়ে ফেলতে পারব৷ আজীবন! সে বলল,
-নেই কোনো সমস্যা?
-না তো!
-ঠিকাছে৷ তা এখন কি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবা? নাকি বাসায় যাবা? সন্ধ্যা তো হলো। বাসায় যাবা না?
-যাব।
-তো চলো?
ও কিছুটা হেঁটে থেমে পেছন ফিরে চাইলো৷ আমি আমার জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছি৷ স্থির৷ সে বলে উঠে,
-কী ব্যাপার? আসছো না যে?
আমি স্থিরতা ভেঙ্গে খানিক এগিয়ে বললাম,
-তুমি না বেড়াতে গিয়েছিলে?
-হ্যাঁ৷
-এক সপ্তাহের জন্যে না?
-হ্যাঁ।
-তাহলে এতো দ্রুত ফিরলে যে?
-ফিরতে হয়েছে৷ প্রয়োজন ছিল।
-কি প্রয়োজন?
-কাল আমাকে দেখতে আসবে৷ বাবার পরিচিত। ছবি দেখে পছন্দ করেছে৷ তাই চলে এলাম। বাবার কথা রাখতে৷ তাদেরও নাকি কি তাড়া আছে৷ তাই আরকি।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমার কান দিয়ে যেন গরম ধোয়া বের হচ্ছিলো। আমি কোনো মতে স্থির থেকে ধীরে ধীরে ওর সাথে তাল মিলিয়ে হেঁটে গেলাম৷ আমার মনে হলো আমি বেশ জটিল একটা শক খেয়েছি৷ নিজেকে কেমন নির্বোধ মনে হচ্ছিলো। আমি কোনো মতে বললাম,
-অভিনন্দন। বিয়ের দাওয়াত দিতে ভুলবে না কিন্তু৷
মীরা আমার দিকে চেয়ে হাসলো৷ কিছু বলল না৷ আমরা দু'জন পার্কের মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ফুটপাতে দাঁড়িয়েই রিক্সাকে ইশারা করলো সে। আমার দিকে চেয়ে বলল,
-বাসায় ফিরতে হবে৷ অনেক কাজ আছে৷ তুমি প্লীজ নিজের খেয়াল রেখো। কী অবস্থা হয়েছে তোমার!
আমি ওর দিকে চেয়ে হাসলাম। বললাম,
-দোয়া করো৷
মীরা রিক্সায় উঠে বসলো! রিক্সাওয়াল মামাকে একটু থামতে বলে সে আমার দিকে ফিরলো৷ বলল,
-কিছু কথা বলি শুনো, আমি আমার জীবনে তোমার মতো গাধা ছেলে দেখিনি৷ তুমি একবার নোটিসও করলা না যে আমি দুইটা ছাতা হাতে এখানে কী করছি। একবার একটা প্রশ্নও করলা না৷ আমি ভেবেছি তুমি যথেষ্ট বিবেকবান। তোমার কথায় তার প্রমাণ পেলেও কাজে পাইনি৷ আচ্ছা তা না হয় মানলাম, কিন্তু তুমি যে ছাতাটা মাথার উপর ধরে আছো, তার সিকের ভাঁজে যে একটা ছোট্ট পত্র রাখা, তা কেন লক্ষ্য করনি? অন্তত সেটা খোলার সময়েই তো তোমার লক্ষ্য করা উচিৎ ছিল। না আপনি তো তা করবেন না৷ আপনি তো জগৎ সংসারের সকল চিন্তা নিজের মাঝে নিয়ে বসে আছেন৷ অসহ্য লোক! মামা চলেন তো! হাজী কলনী চলেন৷
মেয়েটা ধাপাধাপ কতো গুলো কথা বলে চলে গেল৷ আমি কেমন স্থির হয়ে ওর চলে যাওয়া রিক্সার দিকে চেয়ে থাকলাম। বোধ ফিরতেই আমি ছাতার সিকেরর ভাঁজের পত্র খুঁজলাম। ছোট্ট একটা হলুদ খাম টেপ দিয়ে লাগানো৷ আমি কাঁপা কাঁপা হাতে সেটা ছাড়িয়ে নিলাম।
পত্রটা হাতে নিয়ে এপাশওপাশ চাইলাম৷ কোনো লিখা নেই! ভেতরে একটা সাদা কাগজ দেখা যাচ্ছে৷ আমি সেটা বের করে নিলাম। সেখানে সুন্দর করে লিখা,
"শুনো,
আমি এতো উচ্চ বিলাসী কিংবা উচ্চাকাঙ্খী নই৷ আমাকে যদি একটা গোলাপ দিয়েও তুমি প্রপোজ করো, আমি এতো খুশি হবো! ভাষায় প্রকাশ করার মতো না৷ আর তুমি ভাবো, তুমি আমার প্রেমে পড়েছো না? ভুল! পুরোটাই ভুল৷ তুমি একটা স্ক্যামের স্বীকার হয়েছো৷ ভালোবাসা স্ক্যাম। আমার গল্পটা পরে কখনো জানাবো৷ তার আগে ভালো করে প্রপোজ করাটা শিখে নিও৷ তা না হলে তোমার কপালে শনি আছে৷ মনে রেখো৷ "
মীরা।
চিঠির ওপর পিঠে একটা ফোন নাম্বার দেওয়া। ব্যস৷ এতোটুকুই।
আমি দ্রুত ফুটপাতের উপরে উঠে এসে চিঠিটা আবার পড়লাম। আবার পড়লাম। এবং আবার পড়লাম। সবশেষে মনে হলো, এই জগতের সকল রূপ, মায়া এবং সিগ্ধতার পাশাপাশি, পৃথিবীর সকল রসহ্যও এই মেয়ে নিজের করে নিয়েছে৷ মেয়েটা হয়ে উঠেছে জগতের একমাত্র রহস্যময় রূপবতী কন্যা৷
গল্পঃ রহস্যময় রূপবতী কন্যা
.
ভুলত্রুটি বিশেষ ভাবে মার্জনীয়৷
-তাসফি আহমেদ৷